• আজ- লোড হচ্ছে...

কালের সাক্ষী খুলনার তালাবওয়ালা মসজিদ

নজর ডট কম ডেস্ক / ০ বার ভিজিট
আপডেট: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কখনও কখনও একটি স্থাপনা শুধু ইট-পাথর, চুন-সুরকি আর কারুকাজে তৈরি হয় না। তার গায়ে লেগে থাকে সময়ের স্পর্শ, মানুষের প্রার্থনার সুনিবিড় শব্দ এবং অসংখ্য স্মৃতির মায়াবী ছায়া। খুলনা মহানগরীর মুসলমানপাড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘তালাবওয়ালা জামে মসজিদ’ তেমনই এক অনন্য স্থাপনা। দিনের আলোয় সাদা টাইলসে মোড়ানো এর অবয়ব ঝলমল করে ওঠে, আর সন্ধ্যা নামলে বর্ণিল আলোর খেলায় এর রূপ বদলে যায় সম্পূর্ণ এক ঐশ্বরিক আবহে। এই মসজিদের আকাশচুম্বী ২২৬ ফুট উঁচু মিনারটি যেন পরম করুণাময়ের দরবারে তুলে রাখা এক দীর্ঘ প্রার্থনা, যা দূর থেকেই জানান দেয়—এখানে যুগ যুগ ধরে মানুষ এসে মাথা নত করে, খুঁজে নেয় আত্মিক প্রশান্তি। শাহী গেইট পেরিয়ে যখন কেউ এই মসজিদের শান্ত প্রাঙ্গণে পা রাখেন, তখন শহরের যান্ত্রিক কোলাহল যেন বহুদূরে হারিয়ে যায়। অর্কিড, বনসাই, সাইকাস, পাইনাস এবং নানা জাতের শোভাবর্ধক গাছের শ্যামল সবুজ চাদরে ঘেরা থাকে এই সাদা স্থাপত্য। কোথাও রোদের লুকোচুরি খেলা, আবার কোথাও স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা। মনে হয়, প্রকৃতি আর স্থাপত্য এখানে পাশাপাশি বসে নিজেদের হাজার বছরের কোনো প্রাচীন গল্প বলছে। সুউচ্চ চার গম্বুজ, মিনার, সূক্ষ্ম ইসলামী কারুকাজ এবং নৈসর্গিক বাগানের অপূর্ব সমন্বয়ে ‘তালাবওয়ালা জামে মসজিদ’ খুলনা শহরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক স্বতন্ত্র ও গৌরবময় পরিচয় তৈরি করেছে।
জন্মকথা ও ঐতিহ্য: ইতিহাসের সুতিকাগার: এই নান্দনিক মসজিদের পাশেই প্রায় ছয় দশকের বর্ণাঢ্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য বুকে নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ‘জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম মাদরাসা’। ১৯৬৭ সালে প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক ও আলেম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর অণুপ্রেরণা এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক মরহুম আবদুল হাকিম জমাদ্দারের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাজ্ঞ আলেম মাওলানা মুজিবুর রহমান (রহ.) এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। জন্মলগ্ন থেকেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত দ্বীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতি ও আদর্শের আলোকে পরিচালিত হয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী মাদরাসাটি।
শিক্ষার বিস্তার ও বর্তমান রূপ: মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মুশতাক আহমদ ও নায়েবে মুহতামিম মাওলানা হাফিজুর রহমান জানান, বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পড়াশোনা করছেন। তাদের মধ্যে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী আবাসিক হিসেবে মাদরাসার তত্ত্বাবধানে বসবাস করেন। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর থাকা, খাওয়া এবং শিক্ষার যাবতীয় ব্যয়ভার কোনো ধরনের সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ জনগণের দ্বীনি মহব্বত ও দানে পরিচালিত হয়ে আসছে।
মসজিদের অন্দরমহল: আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন: দারুল উলুম মাদরাসার এই আলোকিত গল্প শুধু শ্রেণিকক্ষ আর পাঠ্যবইয়ের পাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সাথে সংযুক্ত জামে মসজিদটির ভেতরেও রয়েছে সেই সফলতার আরেক নান্দনিক অধ্যায়। মসজিদটিতে রয়েছে আধুনিক ফিটিংস, চোখ জুড়ানো আলোকায়ন, নিখুঁত কাঠের কাজ, পরিচ্ছন্ন অজুখানা ও গোসলখানার সুব্যবস্থা। বিশেষ করে শারীরিক অসুস্থতা বা বয়সের ভারে যারা মাটিতে বসে নামাজ আদায় করতে পারেন না, তাদের জন্য রাখা হয়েছে নারকেল ও তালগাছের গোড়া দিয়ে তৈরি প্রায় ২০টি বিশেষ আরামদায়ক চেয়ার। মসজিদের দেওয়ালের নান্দনিক সাজসজ্জা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে হরিণের চামড়ার তৈরি দৃষ্টিনন্দন ওয়ালমেটগুলোতে চমৎকারভাবে খোদাই করা রয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের সুমহান বাণী। সব মিলিয়ে মসজিদের ভেতরের পরিবেশটি তৈরি করেছে সৌন্দর্য, ভক্তি ও প্রশান্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

add 1


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর

এক ক্লিকে জেলার খবর