সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতার কাঠামো কার্যকর করে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-১ অনুবিভাগ থেকে জারি করা আদেশটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ১৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার এ আদেশ জারি করেছে। নতুন বেতনকাঠামো গত ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। তবে নতুন মূল বেতনের পুরোটা একবারে পাচ্ছেন না সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গ্রেডভেদে ধাপে ধাপে বর্ধিত অংশ যোগ হবে। এর ফলে জুলাই থেকে গেজেট জারির আগপর্যন্ত সময়ের প্রাপ্য অর্থও বকেয়া হিসেবে পাবেন তারা। গেজেট অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ পাবেন। অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন বর্ধিত অংশের ৫০ শতাংশ। ওই অর্থ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত বা প্রাপ্য মূল বেতনের সঙ্গে যোগ হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য বর্ধিত অংশের মোট ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য মোট ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে। এরপর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ নতুন মূল বেতনের শতভাগ দেওয়া হবে। প্রথম ছয় মাসে তুলনামূলক কম বেতনের কর্মচারীদের জন্য বর্ধিত অংশের অর্ধেক কার্যকর হচ্ছে। আর উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তা ৪০ শতাংশ। পরের বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় ধাপ এবং জুলাইয়ে গিয়ে নতুন মূল বেতন পুরোপুরি কার্যকর হবে। নতুন বেতনকাঠামোয় ১ম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ। তবে মূল বেতন পুরোপুরি কার্যকর হলেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব, বাংলা নববর্ষসহ অন্যান্য ভাতার নতুন হার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে না। গেজেট অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত এসব ভাতা বিদ্যমান হারে দেওয়া হবে। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী নির্ধারিত হারে ভাতা কার্যকর হবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত বাস্তবায়ন কাঠামোতেও একই সময়সূচি রাখা হয়েছিল। নতুন কাঠামোর সঙ্গে পেনশনভোগীদের সুবিধাও ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হচ্ছে। গেজেটে নিট পেনশনের স্তর অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে বর্ধিত অংশের ৪০ বা ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৭০ বা ৭৫ শতাংশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে তাদের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো অনুযায়ী পূর্ণ নিট পেনশন কার্যকর হবে। জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের দেওয়া আগের ‘বিশেষ সুবিধা’ বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে। ১ জুলাই থেকে গেজেট জারির সময় পর্যন্ত কেউ ওই বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকলে তা নতুন বেতনকাঠামোর অধীনে প্রাপ্য বকেয়ার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করা হয়। অনুমোদিত কাঠামোতে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য ৪০, ৩০ ও ৩০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ৫০, ২৫ ও ২৫ শতাংশ হারে তিন ধাপে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রায় এক যুগ পর নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও আর্থিক প্রভাব পর্যালোচনা শেষে সরকার ধাপে ধাপে নতুন কাঠামো কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয়। পে-স্কেলে পেনশন বাড়বে সর্বোচ্চ ১০০%, ছুটি নগদায়ন ১৮ মাস: এদিকে, নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের নিট পেনশন পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে। এতে বিদ্যমান নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বাড়বে। একই সঙ্গে পেনশনের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অবসর-উত্তর ছুটি ১২ মাস এবং ছুটি নগদায়নের সুবিধা ১৮ মাস রাখা হয়েছে। জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর পেনশনসংক্রান্ত বিধানে বলা হয়েছে, পেনশন ও গ্রাচুইটি বা আনুতোষিকের বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত থাকবে। তবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরা যে নিট পেনশন পেতেন, তার ভিত্তিতে নতুন করে নিট পেনশন নির্ধারণ করা হবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাদের নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা বা তার কম ছিল, তাঁদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে নতুন নিট পেনশন সর্বনিম্ন ১০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনপ্রাপ্তদের বৃদ্ধির হার ৭৫ শতাংশ। তাদের নতুন নিট পেনশন হবে সর্বনিম্ন ১৮ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৬৫ শতাংশ। এই শ্রেণিতে নতুন নিট পেনশন সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার টাকা। ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেননপ্রাপ্তদের পেনশন বাড়বে ৬০ শতাংশ। তাদের নতুন নিট পেনশন হবে সর্বনিম্ন ৪৯ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৬২ হাজার টাকা। আর ৪০ হাজার ১ টাকা ও তার বেশি নিট পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৫৫ শতাংশ। এ শ্রেণিতে নতুন নিট পেনশন সর্বনিম্ন ৬২ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।