সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দহরানে অবস্থিত ভবনটিতে মঙ্গলবারের এ হামলার পর আগুনের সূত্রপাত হলেও দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি তেল স্থাপনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরামকোর ভবনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার পর সৃষ্ট আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এর আগে মঙ্গলবার দিনের শুরুতে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে এসব স্থাপনার আশপাশে অবস্থানরত কর্মচারী ও বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এর কিছু সময় পরই আরামকোর ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে।
ইয়েমেনের হুথি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার আল-সাবাহ এলাকায় অবস্থিত ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানির কেন্দ্রীয় তেল স্টেশন খালি করার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট নির্দেশ দেওয়ার পর হুথিদের পক্ষ থেকে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। জোটের নির্দেশের জবাবে হুথি মুখপাত্র বলেন, সানায় যেকোনো ধরনের বিমান হামলা চালানো হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে এর ‘কঠোর ও বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে রিয়াদ অভিমুখে হুথিদের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করে ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি আরব। এসপিএর বরাতে সৌদি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র জানান, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে চারজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১৫টি বাড়িঘর।
সানার তেল স্থাপনায় বিমান হামলা
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে তেল স্থাপনা খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এ তথ্য জানান। হুথি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার আশঙ্কায় আগেই তেল মজুতাগারগুলো খালি করে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এ কারণে সাধারণ মানুষের জ্বালানি সরবরাহ কিংবা মজুতের ওপর হামলার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
আল জাজিরার প্রতিনিধি ইউসেফ মাওরি জানান, সানার কেন্দ্রীয় তেল স্টেশনে বিমান হামলার পরপরই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তিনি আরও বলেন, সৌদি আরব লোহিত সাগরের রাস ঈসা বন্দরে বিমান হামলা চালিয়ে জ্বালানি তেলের ট্যাংক ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ প্রদেশের একটি তেল কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকির অভিযোগ, হুথিরা এসব স্থাপনা ও ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছিল।
বিমান হামলার পর হুথি মুখপাত্র দাবি করেন, সানায় সৌদি জোটের সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে ইয়েমেনি যোদ্ধাদের সরাসরি সংঘর্ষ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইয়াহিয়া সারি সতর্ক করে বলেন, সৌদি জোট সানায় হামলা অব্যাহত রাখলে আগে থেকে খালি করার নির্দেশ দেওয়া এলাকাগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
মঙ্গলবার দহরানে আরামকোর সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানীতে অবস্থিত আরামকোর একটি তেল শোধনাগারের আশপাশ থেকে সাধারণ মানুষকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা
এর আগে গত শনিবার রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এই হামলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরদিন রোববার একই বিমানবন্দরে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে আরও একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন।
পরপর এসব হামলার পর এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেওয়া সৌদি আরব মঙ্গলবারও হুথিদের একের পর এক হামলার মুখে পড়ে। রিয়াদের উত্তরাঞ্চলে আরও তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে জোট বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গত সপ্তাহ থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটছে। এরই মধ্যে হুথি মুখপাত্র সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দর সম্পর্কেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
এসপিএ জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে এসব হামলার জন্য গোষ্ঠীটিকে ‘চড়া মাশুল’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
