সাতক্ষীরার তালায় বখাটেদের ক্রমাগত উত্ত্যক্তকরণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নীলা খাতুন (১৬) নামের একাদশ শ্রেণির এক কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নের ধুলন্ডা গ্রামে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ঘটনার রাতে নিহত শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে স্থানীয় ৭ জনের নাম উল্লেখ করে তালা থানায় হত্যা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছেন। চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
নিহত নীলা খাতুন ধুলন্ডা গ্রামের লিটন শেখের মেয়ে এবং স্থানীয় মাগুরা আইডিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কলেজে যাওয়া-আসার পথে নীলাকে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার কয়েকজন বখাটে যুবক উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। বিষয়টি পরিবারকে জানালে নীলার বাবা লিটন শেখ একই গ্রামের অফছার শেখের ছেলে প্রধান অভিযুক্ত আমজেত শেখের (৫০) কাছে গিয়ে অভিযোগ জানান এবং তার বাড়ির যুবকদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আসামিরা লিটন শেখের পরিবারের প্রতি চরম শত্রুতাভাবাপন্ন হয়ে ওঠে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত ১ অক্টোবর রাতে আসামিরা সসংঘবদ্ধ হয়ে লিটন শেখের বাড়িতে চড়াও হয় এবং নীলা ও তার পরিবারকে নানা হুমকি-ধমকি দেয়। পরদিন ২ অক্টোবর জেঠুয়া বাজারে লিটন শেখের খাবার হোটেলে গিয়ে নীলাকে নিয়ে কুৎসা ও অপপ্রচার চালায় তারা। একই দিন দুপুরে লিটন শেখ বাড়ি ফেরার পথে আসামিরা তাকে ঘেরাও করে বেধড়ক মারধর করে। খবর পেয়ে নীলা ও তার মা তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে বখাটেরা তাদের ওপরও অতর্কিত হামলা চালায়।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির একটি কক্ষ থেকে নীলার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান স্বজনেরা। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারটির দাবি, আসামিরা নীলাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখেছে অথবা চরম সামাজিক অবমাননা ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে।
ঘটনার পর সোমবার রাতে নিহত নীলার বাবা লিটন শেখ বাদী হয়ে তালা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-০৪)। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন ধুলান্ডা গ্রামের আমজেদ শেখ (৫০), রকি শেখ (২৪), সৈয়েব মালি (১৮), ইমন শেখ (২২), ইমরান শেখ (২৮), আকলিমা বেগম (২৫) ও অফছার শেখ।
মেয়ের মৃত্যুর পর আহাজারি করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে লিটন শেখ বলেন, ‘আমার মেয়েটাকে বখাটেরা প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত করত। আমরা প্রতিবাদ করায় ওরা ঘরে এসে হুমকি দেয়, বাজারে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় এবং আমাদের মারধর করে। আসামিরাই আমার মেয়েকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখেছে, না হয় চরম অপমান করে তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই।’
ঘটনার বিষয়ে তালা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে ৭ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছিল। ঘটনার পর থেকে এজাহারভুক্ত সব আসামি পলাতক। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।’
এদিকে বিষয়টিতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে সাতক্ষীরার বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী মাধব দত্ত বলেন, উদ্ধার হওয়া লাশটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি প্ররোচনায় আত্মহত্যা, তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। ঘটনায় জড়িত মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন।
