দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি। দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, সন্ত্রাস, হামলা-ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।
মিরপুরের সাম্প্রতিক ঘটনার পর একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দলটি কঠোর অবস্থানের বিষয়টি সামনে আনছে। এর মাধ্যমে মূলত বোঝানো হচ্ছে, দলের সঙ্গে সম্পৃক্তত কাউকে অপরাধের দায় থেকে রেহাই দেওয়া হবে না।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বিতর্কিত ও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরের পাশাপাশি জেলা, মহানগর, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায় থেকে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার রাজনৈতিক পরিচয় কোনোভাবেই সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে না। ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক, অভিযোগ তদন্তে সত্যতা মিললে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দেশীয় অস্ত্র ও ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে হামলা চালায় দুই শতাধিক মানুষ। পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেয় তারা।
এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশার নাম আসে। তারা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
বিষয়টি নিয়ে সরকার বিব্রত বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয় শাহ আলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে।
গত বুধবার বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ কয়েকজন নেতাকে ডেকে পাঠান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের পাশাপাশি দলীয় দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে তার বিরুদ্ধে আরো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানানো হয়।
নির্দেশ মেনে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সংসদে গিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
এর আগে, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বহিষ্কার করা হয়, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে।
এছাড়া, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা এবং হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির হাইকমান্ডের কঠোর অবস্থান সামনে আসে।
এদিকে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর নেপথ্যে সরকারি দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতার ইন্ধন রয়েছে- এমন অভিযোগও বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে তুলে ধরেছেন দলের কেউ কেউ। এসব নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও জমা পড়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের সংসদীয় পদ ও দলীয় দায়িত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া, একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর বার্তা দিয়ে ফেনীর এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, “দেশে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করবে। দেশে যাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা দেখেছি, কিভাবে আইনের শাসনকে বিগত ১৭ বছর ভুলুণ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেই পরিস্থিতি পরিবর্তন করে আইনের শাসন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।”
বিএনপির দপ্তর সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর সারা দেশে বিএনপির প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত চার হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে এবং তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। সরকার একটি সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন, অপরাধী যে-ই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “চাঁদ উদ্যান দখলের চেষ্টার ঘটনায় ইতোমধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে জমি দখলের চেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১ জনকে। মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও মালামাল ক্ষতির ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সরকার নির্মোহভাবে কাজ করছে এবং যেখানে কোনো অপচেষ্টা বা অন্যায় হচ্ছে, সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
মাহদী আমিন বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা সরকারের মূল অগ্রাধিকার। যদি কোনো দুষ্কৃতকারী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাহলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে- অপরাধীর কোনো দল বা পরিচয় নেই। কেউ অপরাধে জড়িত হলে তার রাজনৈতিক পরিচয়, পদ বা প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে আইনের আওতায় আনা হবে।”
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বার্তাটি হলো- অপরাধ করলে সে যতই প্রভাবশালী হোক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে প্রশাসনিক পর্যায়েও আরো কঠোর পদক্ষেপ আসতে পারে।” সূত্র: রাইজিংবিডি।
