হেমন্তের আগমনি বার্তা নিয়ে এসেছে আশ্বিন। সেই আশ্বিনের সোনাঝরা রোদে রূপসী সাতক্ষীরায় যেন ফিরে এসেছে একখ- হারানো শৈশব। পলাশপোল থেকে খুলনা রোড কিংবা নিউমার্কেট যেখানে একসময় গান-বাজনা, নাগরদোলা আর কেনাকাটার কলকাকলিতে মুখর থাকত প্রাণসায়র খালের পাড়, সেই স্মৃতি ঘেরাটোপ খুলে দুই বছর পর আবার জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া ২০ দিনব্যাপী এই মেলার মঙ্গলবার ছিল ষষ্ঠ দিন। সকালের মিষ্টি রোদ ওঠার পর থেকেই মেলামুখী হতে শুরু করেন দূরদূরান্তের মানুষ। দুপুরে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কলরবে জমে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। আর সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়তেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢল নামে সব বয়সী মানুষের।
নতুন প্রজন্মের চোখ যখন বৈচিত্র্যময় মেলার আয়োজনে আটকে যাচ্ছে, প্রবীণরা তখন খুঁজে ফিরছেন নিজেদের সোনালী অতীত। আলিপুরের শুকুর আলী (৬৭) ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে মেলায় আসার স্মৃতি হাতড়ে জানান, আগের বিশাল আয়োজন আর বর্তমানের মেলার চেহারায় বিস্তর ফারাক। তবুও শৈশবের সেই আনন্দ আজও মনে দোলা দেয়।
কাঠিয়া সরকারপাড়ার মধুমিতা সরকার (৫২) স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, নতুন জামা পরে মেলায় আসা, বাতাসি-জিলাপি খাওয়ার সেই সামান্য আনন্দই ছিল অগাধ। আজ নতুন প্রজন্মকে হাসতে দেখে তিনি যেন নিজের বাল্যকালকেই নতুন করে দেখছেন।
রসুলপুর গ্রামের মহাব্বত গাজী (৭০) স্মৃতির সরণি বেয়ে মনে করিয়ে দেন প্রাণসায়র খালের কথা। তিনি জানান, একসময় এই খাল দিয়েই দূরদূরান্ত থেকে মালামাল নিয়ে নৌকায় করে মেলায় আসতেন ব্যবসায়ীরা। পলাশপোলের সুবোল ম-লের কণ্ঠেও শোনা গেল একই সুর। মেলা এখন পরিসরে ছোট হলেও তা আবার ফিরে এসেছে এতেই যেন তৃপ্ত শহরের মানুষ।
একদিকে প্রবীণদের স্মৃতিমেদুরতা, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাস দুইয়ের মিলনে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে আশ্বিনের এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। ২০ অক্টোবর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই আয়োজন।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিজ কাউসার আজিজ বলেন,”বাঙালির চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতি, প্রাচীন মেলা ও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে সুন্দরভাবে তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কেনাকাটায় বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তানাদি নিয়ে আনন্দ উদযাপনের জন্য শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে এই মিলনমেলা এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার (এসপি) আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, “উৎসবের আনন্দকে নিষ্কণ্টক, নির্বিঘ্ন ও সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণ ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছ।
পুলিশ সুপার বলেন,দর্শনার্থীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে কেনাকাটা এবং বিনোদন উপভোগ করে ঘরে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে।”
এবার মেলা উপলক্ষে শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের পুরো জায়গা জুড়ে থাকছে প্রায় শতাধিক মনোহরি পণ্যের স্টল। এছাড়া লৌহজাতদ্রব্য, বাঁশ ও বেতের দোকান, নার্সারি দোকান, শিল্পকলা একাডেমির সামনে নাগরদোলা ও রেলগাড়ি, নৌকা, শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার মিষ্টির দোকান। প্রাথমিক পর্যায়ে মেলা চলবে ২০ অক্টোবর পযর্ন্ত।
