অধ্যবসায়, প্রজ্ঞা ও পারিবারিক মূল্যবোধ- এই তিনের সমন্বয়ে যে বিশ্বমঞ্চে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব, তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সাতক্ষীরার কৃতী সন্তান প্রজ্ঞা পারমিতা রহমান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতনামা প্রকৌশল সংস্থা এএসএইচআরএইর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বসেরা তিনজনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এ সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে মিশরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ‘সিআরসি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে’ তাকে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞার এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একাগ্রতা এবং তার মা সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহারের সার্বিক দিকনির্দেশনা। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ করে গড়ে তুলতে মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিযোগিতাটির বাছাই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার উদীয়মান প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থী আবেদন করেন। নথিপত্র মূল্যায়ন ও কয়েক ধাপের কঠিন মৌখিক পরীক্ষার পর বিচারকমণ্ডলী বিশ্বজুড়ে মাত্র তিনজনকে চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করেন। তাদের মধ্যে দুজনই বাংলাদেশের শিক্ষার্থী- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী প্রজ্ঞা পারমিতা রহমান ও তার সহপাঠী আফতাব। অপর বিজয়ী শিক্ষার্থী দুবাইয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের।
বিশ্বসেরা তিনজনের তালিকায় নির্বাচিত হওয়ায় আয়োজক সংস্থা এএসএইচআরএই প্রজ্ঞার ভ্রমণ, আবাসনসহ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সব ব্যয় বহন করে।
সাতক্ষীরার এই কৃতী শিক্ষার্থীর সাফল্যের পথচলা শুরু শৈশব থেকেই। সাতক্ষীরা কিন্ডারগার্টেন, সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পাশাপাশি সাতক্ষীরা জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন।
শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও প্রজ্ঞার রয়েছে সাফল্য। জাতীয় শিশু পুরস্কারসহ জাতীয় পর্যায়ে চার থেকে পাঁচটি সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি।
বিতর্ক অঙ্গনেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য অর্জন। সাতক্ষীরা বিতর্ক দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রজ্ঞা। ২০২১ সালে বিভাগীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তার দল চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই প্রতিযোগিতায় টানা সাতটি ম্যাচে ‘শ্রেষ্ঠ বক্তা’র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
বর্তমানে বুয়েটের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনার পাশাপাশি ‘বুয়েট অটোমোবাইল ক্লাব’-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রজ্ঞার এই পথচলায় পরিবারের সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তার বাবা আলহাজ মো. সাহিদুর রহমান সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের খুলনা শাখার জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত।
মেয়ের আন্তর্জাতিক সাফল্যে আবেগ প্রকাশ করে মা নাজমুন নাহার বলেন, ‘প্রজ্ঞা শুধু আমার একার সন্তান নয়, সে পুরো সাতক্ষীরা ও বাংলাদেশের গৌরব। ছোটবেলা থেকেই ওর মেধার লালন ও বিকাশে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সে যেন বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উঁচুতে তুলে ধরতে পারে এবং ভবিষ্যতে দেশের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করতে পারে—এজন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’
মেধা, নিষ্ঠা ও পরিবারের দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা রহমানের এই সাফল্য দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।









