উপকূলের প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে বেড়ে ওঠা এই শিশুদের চাওয়ার পরিধি খুব বড় নয় একটি নিরাপদ মাথার ছাদ, যেখানে বৃষ্টি নামলে খাতা ভিজবে না, আর ভয় ছাড়া শেখা যাবে নতুন দিনের স্বপ্ন। মাথার ওপর টিনের চালায় ঝুম বৃষ্টি আর সেই ফুটো টিন গলিয়ে নামছে পানি। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার অন্তত ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৯৫টি। এর মধ্যে সাতটি উপজেলার জরাজীর্ণ ভবনবিশিষ্ট ২৫০টি বিদ্যালয়ের তালিকা ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখায় পাঠানো হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা নিরসনে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষকরা জানান, কোথাও পুরোনো ভবনের ছাদ থেকে খসে পড়ছে কংক্রিটের প্লাস্টার, কোথাও আবার রড বের হয়ে ঝুলছে মাথার ওপর। বর্ষা এলে ছাদ চুইয়ে চুইয়ে পানি জমে শ্রেণিকক্ষ যেন ছোট্ট পুকুর। রোদ উঠলে আবার অন্য যন্ত্রণা গোলপাতা আর টিনের চালের নিচে অসহনীয় উত্তাপে অতিষ্ঠ কোমলমতি শিশুরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষক আর বই দিলেই শিক্ষার মান বাড়ে না; প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ। সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশন আর নিরাপদ মাথার ছাদ ছাড়া উপকূলীয় এসব শিশুর ভবিষ্যৎ কেবলই অন্ধকারে ধাবিত হচ্ছে।
জেলার আশাশুনি উপজেলার নবীননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুকুল রানী সরকার বলেন, আমাদের কোনো সুনিষ্ট পাকা ভবন নেই। আধাপাকা গোলপাতার ছাউনির নিচে চরম কষ্ট সহ্য করে ওদের শেখাতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই ভেতরে পানি ঢোকে। এই স্যাঁতসেঁতে আর অনিরাপদ পরিবেশে শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখা তো দূরের কথা, বিদ্যালয়ে উপস্থিত রাখাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
শারমিন আক্তার,রিতারাণী সরকারসহ অভিভাবকেরা বলেন, প্রতিদিন সকালে আমাদের সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।অনেক অভিভাবকেরা তাদের সন্তাদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে বাইরে বসে থাকতে হয়। কোন মুহূর্তেই যেন ঘটে না যায় কোনো বড় বিপর্যয়এই শঙ্কায় কাটে তাদের প্রতিটি ঘণ্টা।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও) মো. রুহুল আমীন বলেন, বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার সাতটি উপজেলার জরাজীর্ণ ভবনবিশিষ্ট ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকা ও তথ্য পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, পিইডিপি-৫ প্রকল্পের আওতায় এসব বিদ্যালয়ের ভবন পুনর্নির্মাণ হবে বলে আমরা আশা করছি। নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে বিদ্যালয় গুলোতে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দমুখর পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেরিয়ে এই ২৫০টি বিদ্যালয়ের পুনর্নির্মাণ কাজ দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা সাতক্ষীরার সচেতন নাগরিক সমাজের।
