২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে এসব কাজ সম্পন্ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যাবে। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নয়, পুরো দেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।”
তিনি বলেন, “কোনো প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্দরসেবার মান কতটা উন্নত হলো, পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কতটা কমল, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল, তার ওপরই প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে।”
মোংলা বন্দরকে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ড্রেজিংয়ের পলি ব্যবস্থাপনা, তেল নিঃসরণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।”
সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এসব বিনিয়োগ নিরাপদ ও সবার জন্য লাভজনক করতে সরকার কাজ করছে।”
তিনি আন্তর্জাতিক অংশীজন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, সহজ সেবা প্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বন্দরের নাব্য, নৌ-চ্যানেলের নির্ভরযোগ্যতা, জাহাজের নিরাপদ চলাচল এবং প্রতিযোগিতামূলক বন্দরসেবা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে মোংলা বন্দরকে আকর্ষণীয় করে তুলে উপযুক্ত বাণিজ্যিক ও পরিচালনগত শর্তে এটিকে ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।”
মোংলা বন্দরকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এ লক্ষ্যে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “পঞ্চগড় থেকে মোংলা পর্যন্ত চার লেনের সমন্বিত সড়ক যোগাযোগ, বন্দরের সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্য পরিবহন সুবিধা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে। খানজাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও কার্যকর ব্যবহারও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।”
মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড, চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা আরও সহজ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দর জ্বালানি, সার, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় পণ্য রপ্তানিতে দেশের একটি পরিপূরক বন্দর হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে।”
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের এ উদ্যোগ দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আস্থা এবং আঞ্চলিক সুষম উন্নয়নে টেকসই আর্থসামাজিক মূল্য সংযোজন করবে।
