সাতক্ষীরা শহরের ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলার পর অবশেষে যেন কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙল। সাতক্ষীরা পৌরসভার শহীদ রীমু সরণির বেহাল দশা নিয়ে ফেসবুকে পোস্টের পর এবার সড়কটির ক্ষয়ক্ষতি ও নির্মাণকাজের কার্যক্রম তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর—১ শাখা থেকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রশাসকের কাছে এ—সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব ড. শাহেদ মোস্তফা স্বাক্ষরিত চিঠিতে অভিযোগটি সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘কল্যাণ ব্যানার্জি’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে প্রকাশিত পোস্টের মাধ্যমে সাতক্ষীরা শহীদ রীমু সরণির সড়ক ক্ষতিপ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগটির ভিত্তিতে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।
শহীদ রীমু সরণি (সরকারি কলেজ সড়ক) পোস্ট অফিস মোড় থেকে পুরাতন সাতক্ষীরা পর্যন্ত বিস্তৃত। সম্প্রতি নির্মিত বা সংস্কার করা এই সড়কের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে ঢেউ খেলানো সড়ক। আবার সড়কের প্রায় ৩০০ ফুট অংশ দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে তৈরি হয়েছে দুর্ভোগ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—সড়কটি যখন মানুষের চলাচলের জন্য, তখন সেটি কি চলাচলের উপযোগী করে রাখার জন্যই বানানো হয়েছিল, নাকি উদ্বোধনের পর তাকে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ হিসেবে রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল?
সড়কের পোস্ট অফিস মোড়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও ঢেউ উঠছে, কোথাও আবার কাজ থেমে আছে—কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা যেন ‘দেখা হবে’ নামের সেই চিরন্তন সরকারি ফাইলের পাতাতেই আটকে ছিল। নাগরিকদের দুর্ভোগ চলছিল, আর কর্তৃপক্ষের নীরবতা দেখে মনে হচ্ছিল—কেউ নন্দলাল হতে না চাইলে বোধহয় দায়িত্ব নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর আমি (সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি) আমার ফেসবুক পেজে ‘দেশটা রসাতলে যাক, আমরা সবাই নন্দলাল হই!’ শিরোনামে একটি পোস্ট করি। সেখানে শহরের ক্ষতিগ্রস্ত শহীদ রীমু সরণির বিভিন্ন অনিয়ম ও নাগরিক দুর্ভোগের বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। সড়কের পোস্ট অফিস মোড় এবং পুরানো সাতক্ষীরা মোড়ে—দুইটি বার (গোল পোস্ট) দিয়ে বড় ও ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে পোস্ট অফিসের মোড়ে বার বসানোর কাজ শুরু করা হয়। ওই লেখায় উল্লেখ করা হয়—সড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ কার স্বার্থে, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে বাঁচাতে? পোস্টটি স্থানীয় সরকার বিভাগের নজরে আসার পরই শহীদ রীমু সরণির বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। অর্থাৎ নাগরিকের চোখে দেখা ক্ষতটি এবার সরকারি কাগজেও দৃশ্যমান হয়েছে।
তবে তদন্তের নির্দেশই শেষ কথা নয়। বরং এখান থেকেই আসল প্রশ্নের শুরু। সম্প্রতি নির্মিত সড়ক এত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হলো কেন? নির্মাণকাজের মান কেমন ছিল? কাজের তদারকি কে করেছেন? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায় কতটুকু? সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তদারকি করেছেন কি না? আর সড়কের প্রায় ৩০০ ফুট অংশ দিনের পর দিন ফেলে রেখে জনভোগান্তি তৈরি করা হলো কেন?
তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। শুধু ‘সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত’ লিখে ফাইল বন্ধ করে দিলে চলবে না; ক্ষতির কারণ, দায়িত্ব এবং জবাবদিহি—তিনটিই নির্ধারণ করতে হবে।
বিশেষ করে ঢেউ খেলা সড়কটি কীভাবে তৈরি হলো এবং নির্মাণের পর এত দ্রুত তার এমন দশা হলো কি করে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন। কারণ সড়ক নির্মাণ যদি জনগণের অর্থে হয়, তাহলে সেই অর্থের প্রতিটি ইট—বালু—খোয়ারও হিসাব জনগণের কাছে দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তটি কেবল কাগজে—কলমে ‘সম্পন্ন’ হয়, নাকি সত্যিই দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়।
আর যদি তদন্তে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু সংস্কারের আশ্বাস নয়—প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই হবে কর্তৃপক্ষের প্রকৃত পরীক্ষা। নাগরিকদের প্রত্যাশা, এবার অন্তত কেউ নন্দলাল হয়ে বসে থাকবেন না। কুম্ভকর্ণের ঘুম যখন ভেঙেছে, তখন চোখটাও যেন পুরোপুরি খোলা থাকে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
