• আজ- লোড হচ্ছে...

বাংলা সাহিত্যের শাশ্বত কণ্ঠস্বর শামসুর রাহমান

রিপোর্টার: / ০ বার দেখেছে
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইট-কাঠের খাঁচায় আটকে পড়া নাগরিক মানুষ যখন নিজের ছায়াকেই ভয় পেতে শুরু করে, কবিতা তখন সেই নিঃশব্দ ট্র্যাজেডির বয়ান তৈরি করে। চার্লস বোদলেয়ারের মতোই পুরান ঢাকার পিচঢালা পথ, ঘিঞ্জি গলি আর বুড়িগঙ্গার আর্দ্র বাতাসে হেঁটে শামসুর রাহমান হাত বাড়িয়েছিলেন মধ্যবিত্তের ধসে পড়া মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্বে।

তবে কলকাতার তিরিশের কবি সমর সেন বা বিষ্ণু দে-র নগর-আক্রান্ত যে নাগরিক হতাশা ও মার্ক্সীয় ক্ষোভ দেখা যায়, রাহমানের রূপকল্প ছিল তার চেয়ে স্বতন্ত্র—পুরান ঢাকার সংকর জনজীবন ও নিজস্ব মানচিত্রের সাথে গাঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। বোদলেয়ারের মতো তিনি কেবল বিচ্ছিন্ন নগর-পথিক হয়ে ঘরের কোণে বসে থাকেননি। উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ যেমন গজলের চিরাচরিত প্রেমানুভূতিকে টেনে এনেছিলেন জনতার লড়াকু ময়দানে, রাহমানও পুরান ঢাকার ফুটপাতের বৈরাগ্যকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন আসাদের রক্তভেজা শার্টে।

​১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে জন্ম নেওয়া এই কবির মনন গড়ে ওঠে পোগোজ স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে। ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, দেশভাগ কিংবা ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন—এসবের ঐতিহাসিক ধাক্কায় তৈরি হয়েছিল তাঁর পরাধীনতাবিরোধী অস্তিত্বের বুনিয়াদি ভিত। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ এবং পরবর্তীতে ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৭) কাব্যগ্রন্থে তিনি বঙ্গীয় আধুনিকতার সমান্তরালে হেঁটে বাংলা কবিতাকে সোজা দাঁড় করান আধুনিক নগর-মনস্তত্ত্বের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে।

ছন্দের প্রাকরণিক বিচারে শামসুর রাহমান অক্ষরবৃত্তের প্রথা ভাঙার এক চতুর কারিগর। প্রচলিত অক্ষরবৃত্তের ৮+৬ বা ৮+১০ মাত্রার অনমনীয় যতিচিহ্ন আর কৃত্রিম পর্ববিশ্রাম গুঁড়িয়ে তিনি কাব্যে আনেন পঙ্ক্তি-অপরিহার্য গতি। প্রথাগত পদ্যে বাক্যের শেষে ক্রিয়াপদ বসানোর শৃঙ্খল ভেঙে তিনি ক্রিয়াপদকে চরণের শুরুতে বা মাঝখানে নিয়ে আসেন। এর ফলে শক্ত পদ্যের চাল ভেঙে জন্ম নেয় কথ্যরীতির প্রাণবন্ত বাচন:

​“তোমাকে পাওয়ার জন্য, / হে স্বাধীনতা,

আর কতবার ভাসতে হবে / রক্তগঙ্গায়?

আর কতবার দেখতে হবে / খাণ্ডবদাহন?”

এখানে মাত্রাপর্বের ভেতরে স্ল্যাশ চিহ্ন দিয়ে কৃত্রিম থামাকে শিথিল করে বাচনিক শ্বাসাঘাতের টানে লাইনগুলোকে তিনি এক অবিচ্ছিন্ন বাকপ্রবাহে ভাসিয়ে দিয়েছেন। পুরান ঢাকার সংকর ভাষা আর মধ্যবিত্তের চলতি বুলি ধরে টি এস এলিয়টের নিয়মে তিনি তৈরি করেছিলেন আধুনিক বাংলা নগর-কবিতার প্রধান ধারা।

​রাহমানের কবিসত্তাকে অনুধাবন করতে হলে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের দ্বিমুখী টানাপোড়েন নির্মোহভাবে দেখা দরকার। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ও ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় দীর্ঘ চাকুরিজীবন সামরিক সেন্সরশিপের মুখে পড়া একজন মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাত। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার ভেতর বন্দি থেকেও জাতীয় সংকটের মুখে তাঁর কলম কখনো হাত গুটিয়ে নেয়নি। ১৯৭১-এর অবরুদ্ধ ঢাকায় ‘মজলিস’ ছদ্মনামে লেখা ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থ কিংবা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় পরাধীনতার যন্ত্রণা নিছক রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকেনি; তা রূপ নেয় আত্মপরিচয় রক্ষার নান্দনিক দলিলে:

​“তোমাকে উপড়ে ফেললে, বলো তো, কী থাকে আমার?

উপড়ে ফেললে আমাকেই উপড়ে ফেলা হয় যে।”

​পরবর্তীতে আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কিংবা নূর হোসেনের আত্মত্যাগে লেখা পঙ্ক্তিগুলো প্রমাণ করে—একসময়ের নিঃসঙ্গ নগর-পথিক কীভাবে প্রজ্ঞাবান রাজপথের দ্রোহী নাগরিকে পরিণত হন।

​কবিতার বাইরে উপন্যাস ‘অক্টোপাস’, আত্মজীবনী ‘কালের ধুলোয় লেখা’, শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর অনুবাদ এবং শিশুসাহিত্যেও তাঁর সাবলীল সৃজনশীল উপস্থিতি ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাত্যহিক ডায়েরির মতো নিয়ম করে কবিতা লিখতে গিয়ে শেষ পর্বের রচনায়—বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের ‘অন্ধকার থেকে আলোয়’ (১৯৯২) বা ‘হরিণের হাড্ডি’ (১৯৯৩)-র মতো বইগুলোতে নান্দনিক শিথিলতা, গদ্যময় আড়ষ্টতা ও চিত্রকল্পের সংক্রামক পুনরাবৃত্তি ধরা পড়ে। প্রবীণ সমালোচক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীসহ একাধিক বিশ্লেষক কবির এই অতিপ্রজতার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছেন। তা সত্ত্বেও, ১৯৯০-এর দশকে অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া এবং ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি নিজ বাসভবনে ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদের হামলার মুখেও নিজের নীতিতে অটল থাকা তাঁকে প্রজ্ঞাবান জাতীয় অভিভাবকের মর্যাদায় বসায়।

​২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট প্রয়াত এই কবির কাব্যচর্চা বৈশ্বিক দরবারে বোদলেয়ার বা পাবলো নেরুদার সমকক্ষ হলেও, বৈশ্বিক সাহিত্য-রাজনীতিতে কেন্দ্র বনাম প্রান্তের বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুবাদের ধারাবাহিক অভাবের কারণে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন অধরা থেকে গেছে। আজ যখন চারপাশের বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, ভিন্নমত দমনের চেষ্টা স্পষ্ট এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ নতুন সংকটের মুখোমুখি, তখন শামসুর রাহমানকে নতুন করে পাঠ করা কোনো পুরনো স্মৃতি রোমন্থন নয়। স্বাধীন চিন্তা ও নাগরিক অধিকার টিকিয়ে রাখার এই কঠিন সময়ে ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’ কাব্যগ্রন্থের রূপকল্পের মতো তাঁর রচনার চিরন্তন পাঠই হতে পারে প্রতিরোধের অম্লান বাতিঘর।

লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার:
add 1


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর

এক ক্লিকে জেলার খবর